অগ্নিপরীক্ষা
রাম - 'এক কাপ চা হবে নাকি ?’
রান্নাঘর থেকে আওয়াজ এলো - 'না কিচ্ছু হবে না, খবরদার চা চা করে জ্বালাবে না, এমাসের তেরো দিন এখনো গ্যাস চালাতে হবে l সেই ত্রেতা যুগ থেকে জ্বালিয়ে আসছে, এই কলিতে এসেও শান্তি দিল না l ‘
রাম - ‘ওই আবার শুরু হল, স্মার্টফোন টা দিয়েই কাল হল, ফেসবুক হোয়াটস্যাপে গুচ্ছের নারীবাদী প্যানপ্যানানি পড়বে আর আমার উপর ঝাল ঝাড়বে l’
সীতা - (রান্নাঘর থেকে খুন্তি হাতে বেড়িয়ে এসে ) ‘ফেমিনিজমের নামে একদম বাজে কথা বলবে না l ত্রেতাতে ফেমিনিজম ছিল না তাই আমাকে দিয়ে দুবার অগ্নিপরীক্ষা দেওয়াতে পেরেছ l কলিতে হলে নারীবাদীরা কক্ষনো এমন হতে দিত না l’
রাম - ‘ভুল প্রিয়ে সব ই ভুল l ত্রেতা থেকে কলিতে তোমরা মেয়েরা কিছুমাত্র বদলাও নি l সেই একই আছ l’
সীতা - ‘কক্ষনো না l একালে মেয়েরা নিজের শর্তে বাঁচে, আমার মত বরের কথায় আগুনে ঝাঁপায় না l’
রাম - ‘আচ্ছা বেশ তুমি বল তুমি আগুনে ঝাঁপাতে রাজি হলে কেন ? আমি তো আর তোমায় ঠেলে আগুনে ফেলিনি l’
সীতা - ‘আহা ন্যাকা ! তুমি বলনি যে আমার সতীত্বে তোমার সন্দেহ আছে অগ্নি পরীক্ষা না দিলে আমায় গ্রহণ করবে না l’
রাম - ‘তা নাই করলাম l অনেকগুলো দিন তো আমাকে ছাড়াই কাটালে, বাকিটাও কাটাতে l আগুনে পুড়তে গেলে কেন ?’
সীতা (গর্ব ভরে ) - ‘ইসস পুড়বো কেন ? আমার নিজের সতীত্বে সন্দেহ ছিল না l’
রাম - ‘তবে তো ল্যাঠা চুকে গেল, নিজের ইচ্ছায় আগুনে ঢুকেছিল, রামায়ণের স্টোরিতে ফুটেজ খাওয়ার জন্য, আমায় দোষ দিচ্ছ কেন ?’
সীতা - ‘কারণ তুমি অগ্নিপরীক্ষার টপিক টা পাবলিকের মাথায় ঢুকিয়েছিলে l তখন পিছিয়ে গেলে লোকে ভাবত সত্যি হয়ত আমার রাবনের সাথে ইন্টুমিন্টু ছিল l ম্যাগো ভাবতেই ঘেন্না করে ! পাবলিক আমাকে নিয়ে ট্রোল করত; সীতা রাবনের কত নম্বর মুখে প্রথম কিস করেছিল l আমার সতীসাধ্বী ইমেজের দফা সারতো l’
রাম - ‘তবে তো তুমি আমার কথায় নয় নিজের ইমেজ বাঁচাতে স্বেচ্ছায় অগ্নিপরীক্ষা দিয়েছ l এতে ফেমিনিজম কি করবে ?’
সীতা - ‘এছাড়া আর কোনো উপায় ছিল ? সেকালে মেয়েরা ইন্ডিপেন্ডেন্টলি বাঁচতে পারত ?’
রাম - ‘কেন পারবে না ? মাতা কৈকেয়ীকে মনে আছে ?’
সীতা - ‘হ্যাঁ ওই হাড়জ্বালানে বুড়ি কে ভুলব ? ওর জন্য চোদ্দ বচ্ছর বনে কাটালাম l তুমি যাই ভালোমানুষ তাই মা বল l না হলে বাল্মীকি তো দিয়েছে ওকে আচ্ছা করে রগড়ে l একেবারে ভ্যাম্প বানিয়ে দিয়েছে l শুনেছি হেলেনকে নাকি ওর রোলটা অফার করেছে l রামায়ণে তো রাবনের পরেই ও ভিলেন l’
রাম - ‘তা ঠিক, কিন্তু ভেবে দেখো মাতা কৈকেয়ী কিন্তু নিজের শর্তে বেঁচেছেন সেই ত্রেতা যুগে l ঠিক করেছিলেন নিজের ছেলেকে রাজা করবেন l তার জন্য যা দরকার করেছেন l এমনকি স্বামীর মৃত্যুশয্যায় শেষ অনুরোধও উপেক্ষা করেছেন l’
সীতা - ‘ঝাঁটা মারো অমন ইন্ডিপেন্ডেনসের মুখে l বর মরে যাচ্ছে তবু তাকে ছেলের মুখ দেখতে দিল না l কি পাষান মেয়েমানুষ !’
রাম - ‘এই মূল্যটুকু তোমাকে দিতে হবে l নিজের শর্তে বাঁচতে গেলে লজ্জা, ঘৃণা, ভয়, ভালোবাসা ত্যাগ করতে হবে l ত্রেতাযুগে তাদের কৈকেয়ী বলত, কলিতে তাদর তসলিমা নাসরিম বা গৌরী লঙ্কেশ বলে l’
সীতা - ‘তার মানে তুমি বলতে চাও অমন জাহাঁবাজ মেয়েমানুষ না হতে পারলে মেয়েরা নিপীড়িতা, নির্যাতিতা হয়ে কাটাবে ? কই ছেলেদের বেলায় তো এমন হয় না ? তোমরা তো কি ত্রেতা কি কলি সব যুগেই স্বাধীন ভাবে বাঁচো l’
রাম - ‘কে বলল হয় না ? এই যে আমি রামচন্দ্র, আদর্শ পুত্র, আদর্শ রাজার ইমেজ রাখতে চোদ্দ বছর বনে কাটালাম l প্রজাদের কথায় প্রিয়তমাকে ত্যাগ করলাম l ভালো তো শুধু তোমাকেই বাসি l অন্য পত্নী গ্রহণ ও করিনি l কিন্তু প্রজাপ্রিয় ইমেজের জন্য তোমাকে ছাড়া জীবন কাটালাম l কোথায় আর নিজের শর্তে বাঁচলাম ? নিজের শর্তে বেঁচেছে রাবন l ইচ্ছে হল, পরস্ত্রী হরণ করল, যুদ্ধ বাঁধাল, পরিণামবিহীন কার্যকলাপে লঙ্কার ধ্বংস ডেকে আনল, যুগে যুগে ভিলেন হয়ে রয়ে গেল l কিন্তু দেখ আমি বা রাবন কেউই নিজেদের ডিসিশনের দায় সমাজের উপর চাপাই নি l কখনো বলিনি বাবা বনে যেতে বাধ্য করেছে বা শূর্পণখা সীতা হরণে বাধ্য করেছে l তোমরা মেয়েরা কেন নিজেদের ইচ্ছে অনিচ্ছে, অক্ষমতা, ডিসিশনের দায় সমাজের উপর চাপাও ?’
সীতা - ‘তুমি যুগপুরুষ, শক্তিশালী, তুমি সমাজের তোয়াক্কা করো না l অবলা নারী কি তা পারে l’
রাম - ‘বাহ্ আমি কি শুধু যুগ পুরুষ ? তুমিও তো লক্ষ্মীর অংশ l পারবে না কেন ? চেষ্টা করে দেখলেই জানা যায় পারো কি না ?
এই যে তুমি দ্বিতীয়বার অগ্নিপরীক্ষা না দিয়ে পাতালপ্রবেশ করলে, তখন কটা লোক তোমাকে অসতী বলেছিল শুনি ?’
সীতা (থতমত খেয়ে) - ‘তাই তো এটা তো ভেবে দেখিনি l কিন্তু যাই বল, কলিযুগে নারীবাদ টারীবাদ হয়ে সাপোর্ট সিস্টেমটা বেড়েছে l’
রাম - ‘কচু বেড়েছে l তুমি ভাবছ অগ্নিপ্রবেশের সময় কেউ তোমার হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গিয়ে বলত, খবর্দার আগুনে ঝাঁপাবে না, ওসব সতীত্ব ফতিত্ব সব বোগাস l রাক্ষস তুলে নিয়ে গিয়ে রেপ করবে সেটাই স্বাভাবিক l না করলে রাক্ষসটা ইম্পোটেন্ট বা সমকামী l রাক্ষসের সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেনশন ডিটারমিন করার জন্য তোমার আগুনে ঢোকার দরকার নেই l
ওরকম হতোনা l হয়না l আগুনে ঢোকাপর্যন্ত সব্বাই ওসব রামসীতার ঘরোয়া ব্যাপার বলে এড়িয়ে যেত l তুমি পুড়েঝুরে গেলে তখন সব মোমবাতি হাতে মিছিল করত l কেউ বলত রাবনের লিঙ্গচ্ছেদ চাই, কেউ বলত মুণ্ডচ্ছেদ চাই, কেউ বলতো রামের যাবজ্জীবন চাই, কেউ বলত গম্মেন্টের পদত্যাগ চাই l ফেসবুকের পাতায় তোমায় নিয়ে গল্প কবিতা লেখা হত l নারীবাদীরা জ্বলাময়ী লেকচার দিত, পুরুষবাদীরা মিম বানাতো l কেউই বুক ফুলিয়ে বলত না সতীত্ব ব্যাপারটা ওভাররেটেড l’
সীতা - ‘তুমি কি ভেবেছিলে রাবন আমাকে ভোগ করেছে ?’
রাম - ‘রাক্ষসের পক্ষে সেটাই স্বাভাবিক নয় কি ? আমি সব জেনেবুঝেই তোমাকে উদ্ধারে এসেছিলাম প্রিয়ে l ভেবেছিলাম তুমি অগ্নিপরীক্ষায় রাজি হবে না, ফলে অযোধ্যার রানী হতে পারবে না l আমি তখন ও বনে l আমি অফিসিয়ালি রাজা হইনি l ভেবেছিলাম ভরতের উপর রাজ্যভার তুলে দিয়ে বাকি জীবনটা তুমি আমি বনবাসে কাটিয়ে দেব l কিন্তু তুমি অগ্নিপরীক্ষায় রাজি হলে l ইমেজ রক্ষার জন্য নিজের শর্তে নিজে বাচঁতে পারলে না, তাই আমার ও নিজের শর্তে বাঁচা হল না l তোমরা নারীজাতি নিজেদের দুর্বল ভেবে শুধু নিজেদের নয়, পুরুষের ও ক্ষতি কর l’
সীতা (দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে )- ‘একথা টা বুঝতে আমার তিন যুগ লাগল l কে জানে কবে কলিযুগের মেয়েরা বুঝবে l
তবে তুমি সত্যি বেশ সাপোর্টিভ স্বামী l’
রাম (মুখে একটা এ আর এমন কি ভাব ফুটিয়ে, মনে মনে ভাবলেন যাক এযাত্রা সীতার মান ভাঙ্গানো গেছে ) - ‘প্রিয়তমা তবে এক কাপ চা ….’
সীতা (মুখে মধুর হাসি ফুটিয়ে, মনে মনে সাত সকালে লেকচার মারছেন দেখাচ্ছি মজা, কত ধানে কত চাল ) - ‘হে প্রিয়তম আজ থেকে যে আমি নিজের শর্তে বাচঁবো l রান্নাবাড়ি আর করব না, মুভি দেখতে চললাম l তুমিও স্বাধীন ভাবে বাঁচো l নিজের কাজ নিজেই কর l চা বানিয়ে খাও l’
রাম (মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল) - ‘সেকি ??’
অতঃপর সীতা মুভি দেখতে গেলেন l রাম জটায়ুদার চায়ের ঠেকে রওনা দিলেন l
লেট নাইট পর্যন্ত ইন্টারনেটে মেয়ে দেখে বেলা করে ঘুম থেকে উঠে লবকুশ দেখে বাড়ি ফাঁকা l তবে কুছ পরোয়া নেহি l ওরা সমাজ থেকে দূরে বনের মধ্যে সিঙ্গল মমের কাছে মানুষ l সমাজের স্টিরিওটাইপ ওদের উপর প্রভাব ফেলেনি l ব্রেড ওমলেটের ব্রেকফাস্ট বানিয়ে ফেসবুকে স্টেটাস দিল 'কুকিং ব্রেকফাস্ট উইথ মাই ব্রাদার’ l
রাম - 'এক কাপ চা হবে নাকি ?’
রান্নাঘর থেকে আওয়াজ এলো - 'না কিচ্ছু হবে না, খবরদার চা চা করে জ্বালাবে না, এমাসের তেরো দিন এখনো গ্যাস চালাতে হবে l সেই ত্রেতা যুগ থেকে জ্বালিয়ে আসছে, এই কলিতে এসেও শান্তি দিল না l ‘
রাম - ‘ওই আবার শুরু হল, স্মার্টফোন টা দিয়েই কাল হল, ফেসবুক হোয়াটস্যাপে গুচ্ছের নারীবাদী প্যানপ্যানানি পড়বে আর আমার উপর ঝাল ঝাড়বে l’
সীতা - (রান্নাঘর থেকে খুন্তি হাতে বেড়িয়ে এসে ) ‘ফেমিনিজমের নামে একদম বাজে কথা বলবে না l ত্রেতাতে ফেমিনিজম ছিল না তাই আমাকে দিয়ে দুবার অগ্নিপরীক্ষা দেওয়াতে পেরেছ l কলিতে হলে নারীবাদীরা কক্ষনো এমন হতে দিত না l’
রাম - ‘ভুল প্রিয়ে সব ই ভুল l ত্রেতা থেকে কলিতে তোমরা মেয়েরা কিছুমাত্র বদলাও নি l সেই একই আছ l’
সীতা - ‘কক্ষনো না l একালে মেয়েরা নিজের শর্তে বাঁচে, আমার মত বরের কথায় আগুনে ঝাঁপায় না l’
রাম - ‘আচ্ছা বেশ তুমি বল তুমি আগুনে ঝাঁপাতে রাজি হলে কেন ? আমি তো আর তোমায় ঠেলে আগুনে ফেলিনি l’
সীতা - ‘আহা ন্যাকা ! তুমি বলনি যে আমার সতীত্বে তোমার সন্দেহ আছে অগ্নি পরীক্ষা না দিলে আমায় গ্রহণ করবে না l’
রাম - ‘তা নাই করলাম l অনেকগুলো দিন তো আমাকে ছাড়াই কাটালে, বাকিটাও কাটাতে l আগুনে পুড়তে গেলে কেন ?’
সীতা (গর্ব ভরে ) - ‘ইসস পুড়বো কেন ? আমার নিজের সতীত্বে সন্দেহ ছিল না l’
রাম - ‘তবে তো ল্যাঠা চুকে গেল, নিজের ইচ্ছায় আগুনে ঢুকেছিল, রামায়ণের স্টোরিতে ফুটেজ খাওয়ার জন্য, আমায় দোষ দিচ্ছ কেন ?’
সীতা - ‘কারণ তুমি অগ্নিপরীক্ষার টপিক টা পাবলিকের মাথায় ঢুকিয়েছিলে l তখন পিছিয়ে গেলে লোকে ভাবত সত্যি হয়ত আমার রাবনের সাথে ইন্টুমিন্টু ছিল l ম্যাগো ভাবতেই ঘেন্না করে ! পাবলিক আমাকে নিয়ে ট্রোল করত; সীতা রাবনের কত নম্বর মুখে প্রথম কিস করেছিল l আমার সতীসাধ্বী ইমেজের দফা সারতো l’
রাম - ‘তবে তো তুমি আমার কথায় নয় নিজের ইমেজ বাঁচাতে স্বেচ্ছায় অগ্নিপরীক্ষা দিয়েছ l এতে ফেমিনিজম কি করবে ?’
সীতা - ‘এছাড়া আর কোনো উপায় ছিল ? সেকালে মেয়েরা ইন্ডিপেন্ডেন্টলি বাঁচতে পারত ?’
রাম - ‘কেন পারবে না ? মাতা কৈকেয়ীকে মনে আছে ?’
সীতা - ‘হ্যাঁ ওই হাড়জ্বালানে বুড়ি কে ভুলব ? ওর জন্য চোদ্দ বচ্ছর বনে কাটালাম l তুমি যাই ভালোমানুষ তাই মা বল l না হলে বাল্মীকি তো দিয়েছে ওকে আচ্ছা করে রগড়ে l একেবারে ভ্যাম্প বানিয়ে দিয়েছে l শুনেছি হেলেনকে নাকি ওর রোলটা অফার করেছে l রামায়ণে তো রাবনের পরেই ও ভিলেন l’
রাম - ‘তা ঠিক, কিন্তু ভেবে দেখো মাতা কৈকেয়ী কিন্তু নিজের শর্তে বেঁচেছেন সেই ত্রেতা যুগে l ঠিক করেছিলেন নিজের ছেলেকে রাজা করবেন l তার জন্য যা দরকার করেছেন l এমনকি স্বামীর মৃত্যুশয্যায় শেষ অনুরোধও উপেক্ষা করেছেন l’
সীতা - ‘ঝাঁটা মারো অমন ইন্ডিপেন্ডেনসের মুখে l বর মরে যাচ্ছে তবু তাকে ছেলের মুখ দেখতে দিল না l কি পাষান মেয়েমানুষ !’
রাম - ‘এই মূল্যটুকু তোমাকে দিতে হবে l নিজের শর্তে বাঁচতে গেলে লজ্জা, ঘৃণা, ভয়, ভালোবাসা ত্যাগ করতে হবে l ত্রেতাযুগে তাদের কৈকেয়ী বলত, কলিতে তাদর তসলিমা নাসরিম বা গৌরী লঙ্কেশ বলে l’
সীতা - ‘তার মানে তুমি বলতে চাও অমন জাহাঁবাজ মেয়েমানুষ না হতে পারলে মেয়েরা নিপীড়িতা, নির্যাতিতা হয়ে কাটাবে ? কই ছেলেদের বেলায় তো এমন হয় না ? তোমরা তো কি ত্রেতা কি কলি সব যুগেই স্বাধীন ভাবে বাঁচো l’
রাম - ‘কে বলল হয় না ? এই যে আমি রামচন্দ্র, আদর্শ পুত্র, আদর্শ রাজার ইমেজ রাখতে চোদ্দ বছর বনে কাটালাম l প্রজাদের কথায় প্রিয়তমাকে ত্যাগ করলাম l ভালো তো শুধু তোমাকেই বাসি l অন্য পত্নী গ্রহণ ও করিনি l কিন্তু প্রজাপ্রিয় ইমেজের জন্য তোমাকে ছাড়া জীবন কাটালাম l কোথায় আর নিজের শর্তে বাঁচলাম ? নিজের শর্তে বেঁচেছে রাবন l ইচ্ছে হল, পরস্ত্রী হরণ করল, যুদ্ধ বাঁধাল, পরিণামবিহীন কার্যকলাপে লঙ্কার ধ্বংস ডেকে আনল, যুগে যুগে ভিলেন হয়ে রয়ে গেল l কিন্তু দেখ আমি বা রাবন কেউই নিজেদের ডিসিশনের দায় সমাজের উপর চাপাই নি l কখনো বলিনি বাবা বনে যেতে বাধ্য করেছে বা শূর্পণখা সীতা হরণে বাধ্য করেছে l তোমরা মেয়েরা কেন নিজেদের ইচ্ছে অনিচ্ছে, অক্ষমতা, ডিসিশনের দায় সমাজের উপর চাপাও ?’
সীতা - ‘তুমি যুগপুরুষ, শক্তিশালী, তুমি সমাজের তোয়াক্কা করো না l অবলা নারী কি তা পারে l’
রাম - ‘বাহ্ আমি কি শুধু যুগ পুরুষ ? তুমিও তো লক্ষ্মীর অংশ l পারবে না কেন ? চেষ্টা করে দেখলেই জানা যায় পারো কি না ?
এই যে তুমি দ্বিতীয়বার অগ্নিপরীক্ষা না দিয়ে পাতালপ্রবেশ করলে, তখন কটা লোক তোমাকে অসতী বলেছিল শুনি ?’
সীতা (থতমত খেয়ে) - ‘তাই তো এটা তো ভেবে দেখিনি l কিন্তু যাই বল, কলিযুগে নারীবাদ টারীবাদ হয়ে সাপোর্ট সিস্টেমটা বেড়েছে l’
রাম - ‘কচু বেড়েছে l তুমি ভাবছ অগ্নিপ্রবেশের সময় কেউ তোমার হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গিয়ে বলত, খবর্দার আগুনে ঝাঁপাবে না, ওসব সতীত্ব ফতিত্ব সব বোগাস l রাক্ষস তুলে নিয়ে গিয়ে রেপ করবে সেটাই স্বাভাবিক l না করলে রাক্ষসটা ইম্পোটেন্ট বা সমকামী l রাক্ষসের সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেনশন ডিটারমিন করার জন্য তোমার আগুনে ঢোকার দরকার নেই l
ওরকম হতোনা l হয়না l আগুনে ঢোকাপর্যন্ত সব্বাই ওসব রামসীতার ঘরোয়া ব্যাপার বলে এড়িয়ে যেত l তুমি পুড়েঝুরে গেলে তখন সব মোমবাতি হাতে মিছিল করত l কেউ বলত রাবনের লিঙ্গচ্ছেদ চাই, কেউ বলত মুণ্ডচ্ছেদ চাই, কেউ বলতো রামের যাবজ্জীবন চাই, কেউ বলত গম্মেন্টের পদত্যাগ চাই l ফেসবুকের পাতায় তোমায় নিয়ে গল্প কবিতা লেখা হত l নারীবাদীরা জ্বলাময়ী লেকচার দিত, পুরুষবাদীরা মিম বানাতো l কেউই বুক ফুলিয়ে বলত না সতীত্ব ব্যাপারটা ওভাররেটেড l’
সীতা - ‘তুমি কি ভেবেছিলে রাবন আমাকে ভোগ করেছে ?’
রাম - ‘রাক্ষসের পক্ষে সেটাই স্বাভাবিক নয় কি ? আমি সব জেনেবুঝেই তোমাকে উদ্ধারে এসেছিলাম প্রিয়ে l ভেবেছিলাম তুমি অগ্নিপরীক্ষায় রাজি হবে না, ফলে অযোধ্যার রানী হতে পারবে না l আমি তখন ও বনে l আমি অফিসিয়ালি রাজা হইনি l ভেবেছিলাম ভরতের উপর রাজ্যভার তুলে দিয়ে বাকি জীবনটা তুমি আমি বনবাসে কাটিয়ে দেব l কিন্তু তুমি অগ্নিপরীক্ষায় রাজি হলে l ইমেজ রক্ষার জন্য নিজের শর্তে নিজে বাচঁতে পারলে না, তাই আমার ও নিজের শর্তে বাঁচা হল না l তোমরা নারীজাতি নিজেদের দুর্বল ভেবে শুধু নিজেদের নয়, পুরুষের ও ক্ষতি কর l’
সীতা (দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে )- ‘একথা টা বুঝতে আমার তিন যুগ লাগল l কে জানে কবে কলিযুগের মেয়েরা বুঝবে l
তবে তুমি সত্যি বেশ সাপোর্টিভ স্বামী l’
রাম (মুখে একটা এ আর এমন কি ভাব ফুটিয়ে, মনে মনে ভাবলেন যাক এযাত্রা সীতার মান ভাঙ্গানো গেছে ) - ‘প্রিয়তমা তবে এক কাপ চা ….’
সীতা (মুখে মধুর হাসি ফুটিয়ে, মনে মনে সাত সকালে লেকচার মারছেন দেখাচ্ছি মজা, কত ধানে কত চাল ) - ‘হে প্রিয়তম আজ থেকে যে আমি নিজের শর্তে বাচঁবো l রান্নাবাড়ি আর করব না, মুভি দেখতে চললাম l তুমিও স্বাধীন ভাবে বাঁচো l নিজের কাজ নিজেই কর l চা বানিয়ে খাও l’
রাম (মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল) - ‘সেকি ??’
অতঃপর সীতা মুভি দেখতে গেলেন l রাম জটায়ুদার চায়ের ঠেকে রওনা দিলেন l
লেট নাইট পর্যন্ত ইন্টারনেটে মেয়ে দেখে বেলা করে ঘুম থেকে উঠে লবকুশ দেখে বাড়ি ফাঁকা l তবে কুছ পরোয়া নেহি l ওরা সমাজ থেকে দূরে বনের মধ্যে সিঙ্গল মমের কাছে মানুষ l সমাজের স্টিরিওটাইপ ওদের উপর প্রভাব ফেলেনি l ব্রেড ওমলেটের ব্রেকফাস্ট বানিয়ে ফেসবুকে স্টেটাস দিল 'কুকিং ব্রেকফাস্ট উইথ মাই ব্রাদার’ l



Very nice ...
ReplyDelete