Bengali love story
হঠাৎ শরীর খারাপ হওয়ায় দাদাকে হাসপাতালে ভর্তি করে আমি ওয়ার্ডের বাইরে ডাক্তারবাবু আসার অপেক্ষা করছিলাম।
পাশে তাড়াহুড়ো করে এসে একখানা আমারই বয়সের আশেপাশের একটা ছেলে বসলো!চুলগুলো বাজেভাবে কাটা, ভুরুটাও কী বিশ্রীভাবে কেটেছে, প্যান্টটাও হাঁটুর কাছে লোফারদের মতো ছেঁড়া, পায়ে হাওয়াই চটি, হাতে একখানা স্টিলের বালা আর তার খানিকটা ওপরে ট্যাটু করে লেখা একটা নাম - 'পিউ'!
প্রথমে দেখে একফোঁটাও ভক্তি হলোনা!
একে-তাকে ফোন করতে লাগলো বারবার!
পাশে বসে চুপ করে শুনতে লাগলাম ফোনে ওর কথাগুলো।
যেটুকু বুঝলাম -
ছেলেটার নাম রকি।
বছর দুয়েক হলো বিয়ে করেছে, দুজনেরই বাড়ির অমতে, পালিয়ে গিয়ে।
মেনে নেয়নি দুজনের কারোর বাড়ি থেকেই,
অগত্যা বাড়ি ছাড়তে হয়েছিল।
সেদিনই, স্টেশনের ধারের বসতিতে একটা টিনের চালের ঘর ভাড়া নিয়ে দুজনে সংসার পাতে।
শুধু ঘর, বাথরুম নেই, পায়খানা বা স্নান করার প্রয়োজন হলে রেলের বাথরুম ছাড়া দ্বিতীয় কোনো রাস্তা তাদের কাছে খোলা ছিল না!
প্রথম কদিন খাবার যোগাতে খুব একটা কষ্ট হয়নি,
কিছু বন্ধু এসে যথাসাধ্য কিনে দিয়ে গেছে।
তারপর সময়ের সাথে সাথে সব মুছে গেছে আস্তে আস্তে, নিজেদের রাস্তা নিজেদেরকেই দেখে নিতে হয়েছে!
বিয়েটা তারা এত তাড়াতাড়ি করে নিতে চায়নি।
ছেলেটা সেকেন্ড ইয়ার পর্যন্ত পড়ছিল, মেয়েটা সবে কলেজে উঠেছিল।
না কলেজে নয়, স্কুলজীবনের প্রেম, ক্লাস সেভেন থেকে!
চাকরির চেষ্টা করছিল ছেলেটা, তারপর ঐ যা হয় আরকি!
মেয়েটার বাড়ি থেকে হঠাৎই মেয়ের অনুমতি ছাড়াই প্যান্ডেল সাজিয়ে ধর্ষণের আয়োজন করতে শুরু করলো!
মেনে নিতে পারেনি তারা দুজনেই এ ব্যাপারটা।
কথা দিয়েছিল - বাঁচতে হলে একসাথে, নাহলে নয়!
এত সহজে মুছে ফেলা যায়না,
ওরা মুছে ফেলতেও চায়নি।
ঠিক করেছিল লড়বে দাঁতে দাঁত চেপে,
যাই হয়ে যাক না কেন!
রঙমিস্ত্রীর কাজ করে ছেলেটা,
দুজনের কোনোমতে চলে যায় তাতে।
মেয়েটাও টুকটাক সেলাইয়ের কাজ করে বাড়িতে।
ঐ টাকায় বছরে একবার দীঘা - আর কী চাই!
বেশ তো বাঁচছে একসাথে, ক্ষতি কী।
আজকে নিয়ে দুদিন হলো পিউ-র বমি থামছে না,
দু রাত ঘুমোয়নি ছেলেটা, বসে ছিল বেডের পাশেই।
মাথা টিপে, চুল আঁচড়ে, ভাত খাইয়ে দিয়েছে।
দুদিন কাজে যায়নি, তাই ইনকাম বন্ধ।
শ চারেক মতো টাকা পড়ে ছিল পকেটে,
তাই নিজে না খেয়ে হাসপাতাল থেকে পিউকে দেওয়া ভাতের অবশিষ্টটুকু খেয়ে বেমালুম কাটিয়ে দিয়েছে দুদিন।
রাতে শুয়ে থেকেছে পিউ-র পাশেই।
ফোনটা কেটে দেখি নীচের দিকে তাকিয়ে চোখ থেকে জল ফেলছে।
আমি আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম -
কী দরকার, টাকা ?
শান্তভাবে চোখ মুছে উত্তর দিল -
পিউকে দরকার, সুস্থ দরকার!
আমি চিন্তা না করতে আশ্বস্ত করতে যাচ্ছি,
এমন সময় আমাকে থামিয়ে বললো -
জানেন তো, পিউ-র বাবা ভাবছে হয়তো এ সময় আমি ওর হাত ছেড়ে পালাবো!
বিশ্বাস করুন - এদেরকে মিথ্যে প্রমাণ করার জন্যই বেঁচে আছি!
আমার হাঁটুর দিকে তাকিয়ে ভাবছিলেন এরম প্যান্ট ছেঁড়া ছেলেরা কেয়ারলেস হয়, তাই তো?
একবারের জন্যে হলেও ভেবেছিলাম, চিন্তাটা মাথায় এসেছিল, তাই মুখ বুঁজে মাথা নীচু করে হাসলাম!
আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ও বললো -
'তিরিশ টাকার শাঁখা-সিঁদুরের নিলামে দাম বেড়ে তিন লাখ হয়েছিল, বিক্রি করিনি!
তাতে যদি আমার রক্ত বিক্রি করে পিউকে খাওয়াতে হয়, তাতেও দুবার ভাববো না!'
লাঞ্চের বেল বাজলো, খাবার এলো।
দরজার বাইরে বেঞ্চে বসে থেকে দেখতে লাগলাম ওদের দুজনকে।
লোভ সামলাতে পারিনি, ছবিগুলো তুলে রেখেছি পরে আবার বারবার দেখবো বলে!
খুব কাছ থেকে আরেকটা লড়াই দেখলাম,
বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে এ আর কম কি!
~ সৌমিক চট্টপাধ্যায়
Bengali love story

No comments:
Post a Comment